বাণিজ্য
কাজ নেই, মজুরি নেই: অনিশ্চয়তায় ২০ হাজার শ্রমিকের পরিবার
চট্টগ্রাম: কর্ণফুলী নদীর পাড়ে এস আলম রিফাইন্ড সুগার ইন্ডাস্ট্রিজের মূল ফটকে এখন বড় তালা। ১ আগস্ট থেকে এই তালা খোলেনি। ভেতরে বয়লার ঠান্ডা। যে ডেলিভারি ইয়ার্ডে দিন-রাত ট্রাকের লাইন লেগে থাকত, সেখানে এখন কাক ডাকে।
ফটকের বাইরে অবশ্য লোকজন আছে। কারখানার সামনে গত বিশ বছরে যে চায়ের দোকান আর টিনের ঘরগুলো গড়ে উঠেছিল, সেখানে প্রতিদিনই ভিড় জমে। আলোচনার বিষয় একটাই: কারখানা আবার কবে খুলবে?
উত্তরটা কারও জানা নেই!
গত ১ আগস্ট থেকে এস আলম গ্রুপের সব কারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ আছে। ইস্পাত, সিমেন্ট, ভোজ্যতেল, চিনি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, বিদ্যুৎ, নৌপরিবহন, বস্ত্র, কোনোটিই চলছে না। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, গ্রুপটিতে শীর্ষ সময়ে ২০ হাজারের বেশি মানুষ কাজ করতেন। আজ সেই সংখ্যা শূন্য।
এদের মধ্যে স্থায়ী কর্মী ছিলেন ১০ হাজার ৫৪৫ জন। অস্থায়ী ও দৈনিক মজুরিতে কাজ করতেন আরও ১ হাজার ৮০২ জন। দৈনিক মজুরির শ্রমিকদের বেশির ভাগেরই কোনো সঞ্চয় নেই, চাকরি ছাড়ার পর পাওনার ব্যবস্থাও নেই। এর বাইরে সরবরাহকারী, রক্ষণাবেক্ষণের ঠিকাদার, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, নৌযানের কর্মী, পরিবেশক আর নিরাপত্তাকর্মী মিলিয়ে প্রায় ৮ হাজার ৫০০ জনের রুটিরুজি এই কারখানাগুলোর ওপর নির্ভর করত। সব মিলিয়ে ধাক্কা লেগেছে প্রায় ৩০ হাজার মানুষের জীবিকায়।
কলোনির দোকানে বাকি বন্ধ
ক্ষতি শুধু কারখানার গেটে থেমে নেই। কর্ণফুলীর শ্রমিক কলোনিগুলোতে মুদি দোকানিরা আগে মাসের বাজার বাকিতে দিতেন, বেতন হলে টাকা মিলত। এখন অনেকেই বাকি দেওয়া বন্ধ করেছেন। স্কুলের বেতন জমছে। কেউ কেউ ছেলেমেয়েদের গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
স্টিল কারখানার এক মেশিন অপারেটর বললেন, “১১ বছর ধরে সকাল ৭টার শিফটের সাইরেন শুনে আমার দিন শুরু হতো। এখন বাসায় বসে থাকি আর আত্মীয়দের কাছ থেকে ধার করি। এভাবে আর কতদিন চলবে?”
রাজস্বেও টান
কারখানা বন্ধের হিসাবটা শুধু শ্রমিকের নয়, সরকারেরও। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে গ্রুপটির সম্মিলিত টার্নওভার ছিল প্রায় ১৯ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা, ডলারের হিসাবে ১.৫৭ বিলিয়ন। ওই বছর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর বাবদ সরকার পেয়েছিল প্রায় ৪ হাজার ১৫২ কোটি টাকা (৩৩৪.৮৫ মিলিয়ন ডলার)। আগস্ট থেকে সেই টাকাও আর কোষাগারে ঢুকছে না।
অর্থনীতিবিদ ড. শায়ের রিয়াজের মতে, এত বড় রিফাইনারি বন্ধ হলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বাজার তা টের পায়। তাঁর ভাষায়, “বাকি প্রক্রিয়াজাতকারীদের ওপর চাপ বাড়ে, দামে প্রতিযোগিতা কমে। আর কাঁচামালের বদলে পরিশোধিত পণ্য আমদানি করতে হলে বাড়তি বৈদেশিক মুদ্রার খরচটা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার পকেট থেকেই যায়। নিত্যপণ্যের দাম স্থির রাখতে হলে দেশীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা দ্রুত চালু করাই সবচেয়ে কার্যকর পথগুলোর একটি।”
একদিকে লোডশেডিং, অন্যদিকে নিত্যপণ্যের দামের চাপ, তার ওপর রাজস্বে ঘাটতি। এই অবস্থায় বন্ধ কারখানাগুলো আবার চালুর প্রশ্ন প্রতিদিন আরও জোরালো হচ্ছে। চট্টগ্রামের কারখানায় যন্ত্রগুলো অপেক্ষায়। কলোনির ঘরে ঘরে শ্রমিকরাও।
