Connect with us

আন্তর্জাতিক

মোদির জন্মদিন উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গে ২০ দিনের নজিরবিহীন আয়োজন, সমালোচনা

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ৭৫তম জন্মদিন আর প্রশাসক হিসেবে তাঁর ২৫ বছরের কর্মজীবন উদ্‌যাপনে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গে নানা আয়োজনের কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। সম্প্রতি এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে রাজ্যের প্রশাসনিক শীর্ষস্থানীয় কর্তা, মন্ত্রী ও বিধায়কদের উপস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই বহুমুখী আয়োজনের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। মোট ২০ দিনজুড়ে চলবে এ আয়োজন।

তবে এ নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের এতে শামিল করার সমালোচনা হচ্ছে। আর পূজার সময় এ আয়োজন করায় খুচরো দোকানের বিক্রি কমবে বলে মনে করছেন দোকানিরা।

রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন থেকে শুরু করে আগামী ৭ অক্টোবর তাঁর কর্মজীবনের ২৫ বছর পূর্তি পর্যন্ত মোট ২০ দিনজুড়ে এই ‘সেবা সংকল্প অভিযান’ এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমুখী কর্মসূচি পালন করা হবে। অতীতে এ ধরনের অনুষ্ঠান পশ্চিমবঙ্গে হয়নি।

রাজ্য সচিবালয় নবান্ন থেকে জারি করা সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, ১৭ সেপ্টেম্বর সূর্যাস্তের পর রাজ্যজুড়ে ‘আশীর্বাদো কি দিয়া’ বা আশীর্বাদের প্রদীপ জ্বালানোর মাধ্যমে এই কর্মসূচির সূচনা হবে। পরিকল্পনার আওতায় থাকা পশ্চিমবঙ্গের মোট ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রেই আলো জ্বালানোর বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিধানসভায় কমপক্ষে ২৫ হাজার প্রদীপ জ্বালানো হবে। অর্থাৎ রাজ্যজুড়ে ওই সন্ধ্যায় ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ মানুষের উদ্যোগে ৭০ লাখের বেশি প্রদীপ জ্বলে উঠবে। নবান্ন, রাজ্য সচিবালয়, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ও কালীঘাট মন্দিরের মতো ঐতিহ্যপূর্ণ স্থানগুলো প্রদীপের আলোয় সাজিয়ে তোলা হবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্মদিন উপলক্ষে।

স্কুলশিক্ষার্থীদের অংশ নিতে হবে অনুষ্ঠানে

প্রধান অনুষ্ঠানটি গঙ্গার তীরে অনুষ্ঠিত হবে বলে জানা গেছে। এই বৃহৎ কর্মযজ্ঞে রাজ্যের ৮০ হাজারের বেশি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়কে যুক্ত করা হয়েছে। বিধানসভাভিত্তিক শিক্ষার্থীদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে তা সংশ্লিষ্ট বিধায়কদের কাছে হস্তান্তরের জন্য জেলা স্কুল পরিদর্শকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেই তালিকা অনুযায়ী পড়ুয়াদের মাথাপিছু একটি প্রদীপ দেওয়া হবে। ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ঠিক সাতটায় নিজের বাড়িতে সপরিবার সেই প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তারা ধন্যবাদ জানাবে এবং ২০৪৭ সালে বিকশিত ভারতের জন্য সংকল্প গ্রহণ করবে। প্রদীপ কেনার জন্য মাথাপিছু দুই টাকা বরাদ্দ করেছে প্রশাসন। শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়, যেসব অভিভাবক সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন, তাঁদেরও এই কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এই বৃহৎ কর্মযজ্ঞে রাজ্যের ৮০ হাজারের বেশি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়কে যুক্ত করা হয়েছে। বিধানসভাভিত্তিক শিক্ষার্থীদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করে তা সংশ্লিষ্ট বিধায়কদের কাছে হস্তান্তরের জন্য জেলা স্কুল পরিদর্শকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

প্রশাসনিক সূত্রকে উদ্ধৃত করে পশ্চিমবঙ্গের প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে আগামী ১০ অক্টোবর পর্যন্ত সময়সীমায় রাজ্যের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিবিধ সামাজিক ও সৃজনশীল প্রতিযোগিতা আয়োজিত হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের পড়ুয়াদের জন্য ‘স্বপ্নের ভারত’ ভাবনার ভিত্তিতে অঙ্কন, কুইজ, তাৎক্ষণিক বক্তৃতা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতার পাশাপাশি ‘নমো সেবা নাটক’ মঞ্চস্থ করার নির্দেশও দিয়েছে স্কুলশিক্ষা দপ্তর। জানা গেছে, উচ্চশিক্ষা দপ্তরের উদ্যোগে ‘বিকশিত ভারত সংকল্প যাত্রা’ কর্মসূচির অধীন পশ্চিমবঙ্গ থেকে ২৫ প্রতিনিধিকে উত্তর প্রদেশে পাঠানো হবে এবং উত্তর প্রদেশের সমসংখ্যক শিক্ষার্থী এ রাজ্যে এসে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর কনটেন্ট সৃষ্টি করে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিরন্তর প্রচার করবে।

ক্রীড়া দপ্তরের অধীন ‘সেবা জ্যোতি যাত্রা’, ‘সেবা সেতু অভিযান’, ‘আলপনা প্রতিযোগিতা’ এবং আইআইটি খড়গপুর বা আইআইএম কলকাতার মতো বিশিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় ‘রাষ্ট্রীয় ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ’ পরিকল্পনাও গ্রহণ করা হয়েছে। গোটা প্রকল্পে যুবসমাজকে যুক্ত করতে মোটরবাইক ও সাইকেল মিছিল, স্বাস্থ্য শিবিরের আওতায় সাফাই অভিযান ও রক্তদান কর্মসূচি রূপায়ণ করা হবে। উৎসবের উৎকর্ষ বাড়াতে প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করে ১০৮ মিটারজুড়ে বিশাল ‘ভারত মণ্ডল’ রঙ্গোলি বা রঙিন আলপনা আঁকার পরিকল্পনাও করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন উদ্‌যাপনে সাধারণ স্কুলপড়ুয়া ও তাদের অভিভাবকদের এক রাজনৈতিক বা সামাজিক সমীক্ষায় শামিল করা হচ্ছে। সরকারি সুবিধার উপভোক্তাদের এভাবে কর্মসূচিতে অংশগ্রহণে বাধ্য করা অনুচিত।

স্বপন মণ্ডল, বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক

এই সুবিশাল কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য, কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে মানুষের জীবনযাপনের যে ব্যাপক হারে মানোন্নয়ন হয়েছে, সেই বার্তা প্রচার করা। সেই উদ্দেশ্যে কেন্দ্র সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি যেমন প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, আয়ুষ্মান ভারত, জল জীবন মিশন অথবা পিএম কিষান সম্মাননিধির মতো প্রকল্পের সুবিধাপ্রাপ্ত পরিবারগুলোকে ‘নমো সেবা গাথা’ (মোদি সেবা কাব্য) এবং ‘কাহানি বদলাও কি’ (পরিবর্তনের কাহিনি) শিরোনামে বিশেষ প্রচার করা হবে।

এর ফলে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের সুবাদে তৃণমূল স্তরে সামাজিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের চিত্র প্রকাশ করা সম্ভব হবে। এই সমগ্র আয়োজনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে মোট ১৩টি বিশেষ উদ্যোগ বা প্রকল্প, যার অন্যতম ‘জনসেবা মহাকুম্ভ’। শুধু তা–ই নয়, প্রতিটি কর্মসূচির আলোকচিত্র এবং ভিডিও তৈরি করে নির্দিষ্ট প্রতিবেদন জমা দেওয়াও আবশ্যক করা হয়েছে। সমগ্র প্রকল্পটি সমন্বয়ের দায়িত্বে রয়েছে তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর।

গোটা প্রকল্পে যুবসমাজকে যুক্ত করতে মোটরবাইক ও সাইকেল মিছিল, স্বাস্থ্য শিবিরের আওতায় সাফাই অভিযান ও রক্তদান কর্মসূচি রূপায়ণ করা হবে। উৎসবের উৎকর্ষ বাড়াতে প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করে ১০৮ মিটারজুড়ে বিশাল ‘ভারত মণ্ডল’ রঙ্গোলি বা রঙিন আলপনা আঁকার পরিকল্পনাও করা হয়েছে।

সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, ৭ অক্টোবর এই মহা-আয়োজনের অন্তিম দিনে রাজ্যের প্রতিটি জেলা সদরে বড় মাপের সরকারি অনুষ্ঠান আয়োজিত হবে এবং সব জেলার সাধারণ মানুষের উদ্দেশে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী, যা ইন্টারনেট মাধ্যমের সাহায্যে প্রচারিত হবে। এর পাশাপাশি পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে নিয়ে কলকাতার নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে একটি কেন্দ্রীয় সমাপ্তি অনুষ্ঠানেরও পরিকল্পনা থাকছে।

তবে নন্দীগ্রাম বা রেজিনগরের মতো বিধানসভা এলাকা যেখানে উপনির্বাচন হতে চলেছে, সেখানে নির্বাচন কমিশনের আদর্শ আচরণবিধি মেনে কোনো সরকারি কর্মসূচি হবে না বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, উল্লিখিত অঞ্চলের জনসাধারণ চাইলে ব্যক্তিগত বা সামাজিক স্তরে এই মহা-উদ্‌যাপনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন।

বিক্ষিপ্ত সমালোচনাও হচ্ছে

রাজ্য সরকারের উদ্যোগে এই বিশাল উদ্যোগকে ঘিরে ইতিবাচক উদ্দীপনার পাশাপাশি মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া গিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষাবিদ ও শিক্ষক সংগঠনগুলোর একাংশের তরফে। বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির সাধারণ সম্পাদক স্বপন মণ্ডলের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন ও কর্মজীবনের রজতজয়ন্তী উদ্‌যাপনের মাধ্যমে সাধারণ স্কুলপড়ুয়া ও অভিভাবকদের এক রাজনৈতিক বা সামাজিক সমীক্ষায় শামিল করা হচ্ছে। সরকারি সুবিধার উপভোক্তাদের এভাবে কর্মসূচিতে অংশগ্রহণে বাধ্য করাকে অনুচিত বলে দাবি করে তিনি এই উদ্যোগের কড়া সমালোচনা করেছেন।

রাজ্যজুড়ে ওই সন্ধ্যায় ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ মানুষের উদ্যোগে ৭০ লাখের বেশি প্রদীপ জ্বলে উঠবে। নবান্ন, রাজ্য সচিবালয়, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল এবং কালীঘাট মন্দিরের মতো ঐতিহ্যপূর্ণ স্থানগুলো প্রদীপের আলোয় সাজিয়ে তোলা হবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্মদিন উপলক্ষে।

পাশাপাশি পুজোর মুখে এর ফলে খুচরো দোকানের বিক্রি কমবে বলে মনে করছেন দোকানিরা। ‘ইতিমধ্যেই মানুষ কেনাকাটা অনেক কমিয়ে দিয়েছেন। এর প্রধান কারণ নানা স্তরে বাজারের ওপর আঘাত এসেছে। বেআইনি দোকান বলে একাধিক রেস্তোরাঁ, হোটেল ইত্যাদি বন্ধ করা হয়েছে, হকার তুলে দিয়েছে এবং পাশাপাশি বড় বাড়ি, (মূলত ফ্ল্যাট বাড়ি) বানানোর অনুমতি দিচ্ছে না সরকার। এর ফলে মানুষের হাতে যে বাড়তি অর্থ টাকা থাকে, তা পুজোর আগে নেই। তার ওপর সরকার এখন ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন পালনে। এতে আপত্তির কিছু নেই, কিন্তু তার পরিবর্তে বাজারে আরেকটু অর্থ ঢোকাতে পারলে ভালো হতো বলে মনে হয়’, মন্তব্য দক্ষিণ কলকাতার সর্ববৃহৎ গরিয়াহাট বাজার সমিতির এক নেতার। তবে নিজের নাম প্রকাশ করতে চাইলেন না তিনি।

অনেকেই বলছেন, আগের সরকার ধারাবাহিকভাবে নানা ধরনের উৎসব ও মেলার আয়োজন করত, বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ সরকার সেটাকেই একটু পাল্টে নানা ধরনের ধর্মীয় গুরু শহরে এনে ‘ইভেন্ট’ করছে অথবা প্রধানমন্ত্রী জন্মদিন পালন করছে। এভাবে সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নতি সম্ভব কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে সরকারের ক্ষমতায় আসার চার মাসের মাথায়।

Continue Reading

Copyright © 2026 Dainik Bangla